
উখিয়ায় ‘৪০ হাজার ইয়াবা গায়েব’ কাণ্ড: ওসি ও সেকেন্ড অফিসার পুলিশ লাইনে, অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া এসআই সুমন এখনো বহাল
মোহাম্মদ রাশেদ: কক্সবাজার
কক্সবাজারের উখিয়া থানায় বহুল আলোচিত ‘৪০ হাজার ইয়াবা গায়েব’ কাণ্ডে সুস্পষ্ট লিখিত অভিযোগ ও বিভাগীয় তদন্তে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা মিললেও অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া এসআই সুমনের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় উখিয়া থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নূর আহামেদ ও সেকেন্ড অফিসার সনজিত মন্ডল পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হলেও এসআই সুমনের বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি সকালে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের টিএনটি গুচ্ছগ্রাম এলাকায় পুলিশের একটি অভিযানে স্থানীয়ভাবে প্রায় ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও থানায় কোনো মামলা রুজু হয়নি, হয়নি কোনো জব্দ তালিকা প্রস্তুত কিংবা মালখানায় জমা দেওয়ার রেকর্ড।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে করিম নামের এক ব্যক্তি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ ইয়াবা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জব্দ না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও পুলিশ বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া বিভাগীয় অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়ায় উখিয়া থানার তৎকালীন ওসি নূর মোহাম্মদ ও সেকেন্ড অফিসারকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। তবে রহস্যজনকভাবে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া এসআই সুমনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা নিয়ে পুলিশের ভেতর-বাইরে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠা এসআই সুমন গণমাধ্যমকে জানান, টিএনটি গুচ্ছগ্রাম এলাকায় তার নেতৃত্বে কোনো অভিযানই পরিচালিত হয়নি। অপরদিকে, তৎকালীন ওসি নূর মোহাম্মদ দাবি করেন, ওই অভিযানে কোনো মাদক উদ্ধার হয়নি।
পুলিশের দুই কর্মকর্তার এই বিপরীতমুখী বক্তব্য পুরো ঘটনাকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। যদি অভিযানই না হয়ে থাকে, তাহলে ৪০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য স্থানীয়ভাবে ছড়াল কীভাবে? আর যদি মাদক উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে সেটি মালখানায় জমা না দিয়ে কোথায় গেল এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
সচেতন মহল বলছে, দেশের সীমান্তবর্তী ও মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে ইয়াবা কারবার বহুদিন ধরেই বড় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ইস্যু। সেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা শুধু পুলিশের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করে না, বরং মাদকবিরোধী অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ‘ইয়াবা গায়েব’ কাণ্ডের মতো ঘটনা ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকবে।
তাদের দাবি, অভিযানের নেতৃত্বে থাকা এসআই সুমনকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া কথিত ইয়াবার প্রকৃত হদিস বের করা এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তি নয়, অপরাধই বড় আর সে অপরাধ যদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরেই ঘটে, তাহলে তার স্বচ্ছ ও কঠোর বিচার হওয়াই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোহাম্মদ রাশেদ
যোগাযোগঃ 01332784449
ইমেইলঃ ukhiaprotidin@gmail.com
© সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত উখিয়া প্রতিদিন-২০২৫ ইং